ছোট গল্পঃ ক্রিমিনাল কেইস

কনফারেন্স রুমে গুরুত্ত্বপূর্ণ একটা মিটিং চলছে এমন সময় ভাইব্রেশন সহকারে  মোবাইল স্ক্রিনে তনিমার ছবি ভেসে উঠে। টেবিলের উপরে ফোন রাখা ছিল । বিরক্তিভরা দৃষ্টিতে সবাই শিহাবের দিকে তাকিয়ে আছে । এক্সকিউজমি বলে মোবাইল টা সাইলেন্ট করে পকেটে রাখে শিহাব । টানা ২ ঘন্টা মিটিং শেষে কনফারেন্স রুম থেকে বের হয়ে নিজের চেম্বারে বসে মোবাইল চেক করে । ২৬ টা মিসডকল । ১০ টা তনিমার, ৫ টা বন্ধু রুমেলের আর বাকি গুলো আননোন নাম্বার থেকে ।শিহাব ভেবে পায় না, একবার কল করার পর রিসিভ না করলে বড়জোড় দ্বিতীয়বার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে তাই বলে এত বার কল করতে হবে! শিহাব যে বড় মাপের অফিসার চেনা নাম্বার থেকে ফোন আসলেই ধরার সময় পায় না সেখানে আননোন নাম্বারে ফোন ব্যাক কিংবা কথা বলার তো কোন প্রশ্নই আসে না । সুতরাং প্রথমেই সে হেড অফিস তথা স্ত্রী তনিমার নাম্বারে কল ব্যাক করল । অগ্নিমূর্তি রুপবতী তনিমা ও পাশ থেকে অভিমানি সুরে বলে, এত বার ফোন দিচ্ছি আর এখন তোমার ফোন ব্যাক করার সময় হলো? তুমি আর আমার সাথে জীবনেও কথা বলবে না । অভিমানীর অভিমান ভাঙ্গানোর সকল চেষ্টাই করে শিহাব । দশ টা না পাঁচ টা একটা মাত্র বউ, রাগ করলে চলে !

শিহাবঃ এখন কাজের কথা বলো, কি এমন গুরুত্ত্বপূর্ণ কথা যেটা তুমি বলতে ১০ বার কল করলে?

তনিমাঃ দুপুরে খেয়েছো?

শিহাবঃ এই তোমার গুরুত্ত্বপূর্ণ কথা? ওহ তুমি না !

তনিমাঃ তুমি না খেলে আমি খেতে পারি না । আর শোন, আজ কত তারিখ মনে আছে?

শিহাবঃ কেন ১২ সেপ্টেম্বর । কোন বিশেষ দিন??

তনিমাঃ ওমা এত তারাতাড়ি ভুলে গেলে? তুমি এত আত্মভোলা? তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসোনা।

শিহাবঃ আহা কি সব যাতা বলছ । কাজের চাপে সব ভুলে যাই। সোনা বউ একটু বলতো আজ কোন দিন?

তনিমাঃ বুদ্ধু আজ তোমার আমার ম্যারিজ ডে ।

শিহাবঃ ও মাই গড ! আমি একদম ভুলে গেছি । আমি ৭ টার মধ্যে বাসায় ফিরছি । এখন রাখছি। বাই।

 

ফোন রেখে আনমনে ভাবতে থাকে, এত বেখেয়ালি আমি! ৬ষ্ট ম্যারিজ ডে তে এসে বেমালুম ভুলে গেলাম । তবে একটা বিষয় ভেবে খুব খুশি হয়, জীবনে আর কিছু পাই না পাই জীবন সঙ্গিনী হিসেবে এমন একজন কে পেয়েছি যাকে নিয়ে গর্ব করা যায়, ভাবা যায় আমার জীবন ধন্য। আমার জন্য যথোপযুক্ত একটা মেয়ে । তনিমার ভাবনার সম্পূর্ণটাই শিহাব কে নিয়ে । এক কথায় আদর্শ পতিভক্ত স্ত্রী । এযুগে এমন মেয়ে শতকরা না বলে লাখে একটা বলা যায় । ভালোবাসার আধিক্য এতই বেশি যে এই ৬ বছরে একটি একটি দিনের জন্যও দুজন আলাদা থাকে নি । এমন কি তনিমাকে বাবার বাসায়ও যেতে দেয় না শিহাব । পরিবর্তে শশুর শাশুরি মেয়ের বাড়িতে এসে বেড়িয়ে যায় । এ নিয়ে তনিমার কোন অভিযোগ অনুযোগ নেই । সে নিজেও শিহাব কে ছেড়ে থাকতে পারে না । আত্মীয়স্বজন অনেক হাসাহাসি তামাশা করে কিন্তু তাতে ওদের কিছু যায় আসে না। ভালোবাসা এমনই। কোন তিরষ্কারের তোয়াক্কা করে না ।

অফিস শেষে শিহাব ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড থেকে আশি হাজার টাকা দামের নেকলেস, মিষ্টার বেকার থেকে সেলিব্রেশন কেক আর শাহবাগ থেকে তনিমার পছন্দের বেলি ফুলের মালা কিনে বাসায় ফিরে ১০ টায় । বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে । হালকা বাতাসও বইছে । বৃষ্টি আসবে বোধয় । ম্যারিজ ডে অথচ কোন গেস্টের আনাগোনা নেই । নিরবতাই এ জুটির বেশি প্রিয় । দরজায় নক করা মাত্র খুলে যায় । শিহাব হতবম্ভ হয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষন । এ কাকে দেখছে ? গাঢ় নীল রঙের সিল্কের শাড়ী পরিহিত ঠোটে লাল লিপস্টিক দেওয়া এলোচুলে দাঁড়িয়ে এক সর্বনাশা রুপের নারী । কপালে টিপ চোখে কাজল দেওয়া । বাতাসে চুলগুলো উড়ছে । এরুপ দেখে খুশিতে শিহাব আর স্থির থাকতে পারে না । কেক আর ফুল রেখে জড়িয়ে ধরে তনিমাকে ।

শিহাবঃ কি ব্যাপার কাউকে দাওয়াত করনি?

তনিমাঃ না।  এই ম্যারিজডে টা স্পেশালি শুধু তোমার আমার । ক্যান্ডেল নাইট ডিনারের ব্যাবস্থা করেছি । তারাতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাও ।

 

থাকার ঘর টাতে শুধু মোমবাতি জ্বলিয়ে রাখা হয়েছে । বাইরে গুরি গুরি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে । থামার কোন লক্ষন নেই । মনে হয় সারা রাত চলবে। দুজনে একসাথে কেক কাটে আর তারপর ডিনার সেরে সব গুলো মোমবাতি নিভিয়ে দিয়ে জানালার পাশে চলে আসে দুজন। অন্ধকারে তনিমার গলায় নেকলেস টা পরিয়ে দেয় শিহাব । তনিমা ভিষণ খুশি । রাতটা কে স্মরণীয় করে রাখতে ডিপ ফ্রিজ থেকে স্কচ বের করে দুজনেই পান করা শুরু করে । তনিমা অভ্যস্ত নয়। তাই এক পেগ খাওয়ার পর আর খেতে পারে না । শিহাব বোতলের প্রায় অর্ধেক টা একাই শেষ করে ফেলে । জানালা দিয়ে ঝিরি ঝিরি বাতাস বইছে আর বিছানায় খাটের হেলান দিয়ে শিহাব তনিমা। বৃষ্টির পরিমান বেড়ে গেছে । শিহাব হঠাৎ করে হো হো করে হেসে ওঠে।

তনিমাঃ কি হলো এভাবে হাসছো কেন? নেশা বেশি ধরেছে?

শিহাবঃ না না । একটা ঘটনা মনে পড়ে হাসছি । তোমার কি সুমনের কথা মনে আছে?

তনিমাঃ থাকবে না কেন? তুমি আমি আর সুমন তিনজন ছিলাম বেষ্ট ফ্রেন্ড । কিন্তু সে আজ আমাদের মাঝে নেই । আমাদের বিয়ের একবছর আগে কে বা কারা তাকে খুন করে ।

শিহাবঃ হা হা হা । কে আবার খুন করবে ? তুমি জান ঐ শালা তোমাকে ভালোবাসত ।

তনিমাঃ কি বলছ এসব। সুমন তো কোন দিনই আমাকে বলেও নাই  এমন কি বুঝতেও দেয়নি ।

শিহাবঃ তোমাকে প্রেমের যত চিঠি দেওয়া তার সবই ওর লেখা । তোমার সাথে আমার ঘনিষ্টতা বেশি ছিল বলে ও আমাকে দিয়ে তোমার কাছে চিঠি দিত । আর আমি সব ঠিক রেখে প্রেরকের জায়গায় আমার নাম বসিয়ে দিয়েছি । আমি কি অত সাহিত্য মার্কা ভাষা দিয়ে চিঠি লিখতে পারি? তুমি তো কোন চিঠিরই জবাব দাওনি ।

তনিমাঃ কি বল তুমি? এত বছর পর এসব কি আবল তাবল বলছ ? নেশার ঘোরে কি যাতা বলছো?

শিহাবঃ আমি যাতে মাতাল তালে ঠিক । তুমি আমি বিয়ে করি ২০০১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর । তার আগে অর্থাৎ ২০০০এর ১৪ ফেব্রুয়ারি সকালে ওর লাশ পাওয়া যায় । ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে আমি সুমনের বাসায় ছিলাম । ওর বাবা মা কেউ ছিলা না । গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল । রাতে সে বলে ১৪ ফ্রব্রুয়ারি সে তোমাকে আনুষ্ঠানিক প্রোপোজ করবে । আমার মাথায় রক্ত চেপে যায় । আমি ওকে বলি, তনিমাকে আমিও ভালোবাসি। সে আমাকে গাদ্দার বলে গালি দেয়। এবং গো ধরে যেকোন মুল্যেই তোমাকে বিয়ে করবে । আমি আর স্থির থাকতে পারি না। রুমে ছিল একটা ক্রিকেট ব্যাট । ওটা দিয়ে আমি সজোরে ওকে মাথায় বাড়ি দেই । মাথা ফেটে চিড়িক দিয়ে গরম রক্ত বের হতে থাকে ।রক্তের বন্যায় ঘর ভেসে যায় । ঐ সময়ও এরকম বৃষ্টি হচ্ছিল । তোকে মেরে ফেললে তার কোন সাক্ষী প্রমান থাকবে না । তনিমাকে বিয়ে করব আমি । সুমন মৃতপ্রায় অবস্থায় বলেছিল “ এই বৃষ্টিই একদিন সাক্ষি দিবে তুই আমার খুনি । আমি তোকে অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছি তুই কোন দিন সুখি হতে পারবি না । তুই ধ্বংস হয়ে যাবি “।  তারপর আমি খুব হেসেছিলাম। আজও হাসছি । সেই রাতেই ওর রুম পরিষ্কার করে ওকে বস্তায় ভরে বেরিবাধ এলাকায় ফেলে আসি । সারা রাত বৃষ্টিতে ভিজে আমার জ্বর এসেগিয়েছিল । তোমার মনে আছে ১৪ ফেব্রুয়ারি শরীরে জ্বর নিয়ে তোমাকে এক গুচ্ছ গোলাপ দিয়ে প্রোপোজ করেছিলাম ?

 

চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল তনিমা। চোখের কোন দিয়ে অবিরত লোনা পানি গড়িয়ে পরছে তনিমার।কাদো কাদো গলায় বলে, তুমি এত খারাপ? কিভাবে পারলে এত কাছের বিশ্বস্ত বন্ধুকে খুন করতে? এতদিন আমি তোমার মত একটা খুনির সাথে সংসার করে আসছি?

 

মাতাল শিহাব কখন ঘুমিয়ে পড়েছে দুজনের কেউই জানে না । সকালে না খেয়েই অফিসে চলে যায় শিহাব । ১০ টার সময় হঠাৎ কলিং বেল বেজে ওঠে । পুলিশ । তনিমাকে জিজ্ঞেস করে এটা কি শিহাব সাহেবের বাসা? আর আপনি নিশ্চয়ই তনিমা?

তনিমাঃ জি।

পুলিশঃ আপনার স্বামীকে গতকাল অনেকবার কল করেছি কিন্তু উনি রিসিভ করেন নি। বাধ্য হয়ে বাসায় আসতে হলো । দেখুন তো এই ছবির মানুষ গুলো আপনারা কিনা?

তনিমার হাতে যে ছবি তা ওদের ৪র্থ বর্ষের ইন্ডিয়া স্টাডি ট্যুরের একটা ফটো । তিনজনেই একই ধরণের লকেটযুক্ত তিনটা চেইন কিনেছিল। গলায় পরে আবার ফটোসেষন করেছিল। সেই ফটো।

পুলিশঃ সুমন যেদিন খুন হয় সেদিনও সুমনের গলায় সেই লকেট ছিল এবং সেখানে আরো একটা এক্সট্রা লকেট ছিল । মামলার তদন্তের কোন কুল কিনারা না পেয়ে ওর মার কাছ থেকে ছবির এলবাম থেকে এই ছবিটা কালেক্ট করি । সেই সুত্রে আপনার কাছে আসা । আপনার লকেটটি কোথায়????

 

বিবেকের দংশনে অবিরত দংশিত তনিমা গত রাতের মাতাল অবস্থায় তার স্বামী যেসব কথা স্বীকার করেছে সেসবই সে পুলিশের কাছে বলে দেয় ।

 

রাতে বাসায় ফেরে স্ত্রীর কাছে মিনতি করে বলে সোনা বউ, কাল রাতে তোমাকে যা যা বলেছি তার সবই মিথ্যা । তুমি কিছুই বিশ্বাস করোনা । দুই হাত দিয়ে তনিমার মুখ ধরে বলে শুধু তোমাকে পাওয়ার জন্যই আমি সব করেছি । তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে? আস্তে আস্তে দুই হাত তনিমার গলায় চলে আসে । হঠাৎ হাতের মোলায়েম পরশ কঠোর হয়ে যায়। শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে তনিমার । সর্ব প্রকার চেষ্টা ব্যার্থ হয়ে অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে রুপবতী মায়াময় সর্বাধিক ভালোবাসার মানুষ তনিমা ।

 

জোড়া খুনের শিহাব পালাতক । পুলিশ তাকে হারিকেন দিয়ে খুজছে ।

Permanent link to this article: https://www.borgomul.com/rafiq/1461/


মন্তব্য করুন আপনার ফেসবুক প্রোফাইল ব্যবহার করে

2 comments

  1. ভাই রফিক! তুই কাউরে পছন্দ করলে আগেই বলিস, ওই মাইয়ার দিকে তাকামু না

    1. ভাই তোর গার্ল ফ্রেন্ড রে আমি ভাবি ডাকতে চাই। আর কোন ইচ্ছা নাই

মন্তব্য করুন

Discover more from বর্গমূল | Borgomul

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading