Internet’s own boy

কম্পিউটার বিজ্ঞানী টিম বার্নার্স লি ১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে একটা প্রস্তাব করেন। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন এক নেটওয়ার্কের যাতে তথ্য ঘুরে বেড়াবে নির্বিঘ্নে। পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের জন্য একটা করে দরজা থাকবে যা দিয়ে সে নেটওয়ার্কে থাকা তথ্য সাগরে ডুব দিবে। দরজার চাবি হবে একান্তই তার। মানুষ হবে মুক্ত স্বাধীন। সে কী শিখবে, কী জানবে, কী দেখবে – তা কেউ নির্ধারণ করে দিবে না। তার এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই আজকের আধুনিক Internet  দাঁড়িয়ে আছে । কিন্তু তাঁর সেই আধুনিক,মুক্ত- স্বাধীন মানুষের স্বপ্ন কী সত্যি হয়েছে? – এই প্রশ্নটা থেকেই যায়।

এমনিতে এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর সব প্রান্তে ইন্টারনেট এখনও পৌঁছে দেওয়া যায় নি। তার উপর ইন্টারনেটে বসছে সেন্সর। সেন্সরের একটা ভালো দিক আছে – তথ্য সুরক্ষিত থাকে। শিশুদের হাতে পর্ণোগ্রাফী পৌছানো রোধ করা যায়। কিন্তু সেন্সর যখন সভ্যতার অর্জিত জ্ঞানের উপর বসানো হয় তখন আর সেটার উদ্দেশ্য ভালো থাকে না।  ইন্টারনেটের মুল উদ্দেশ্য এর উপরই তা আঘাত হানে। তাই এই ধরনের সেন্সরের উপর সবসময়ই কিছু মানুষ প্রতিবাদ করে যাচ্ছে। আজকে আমরা তেমনই একজন মানুষ সম্পর্কে শুনব।

aaron-swartz-mit-motion

Aaron Hillel Swartz (এরন হিলেল সোয়ার্জ), একজন  আমেরিকান  প্রোগ্রামিং প্রডিজী (Prodigy)।  একজন কম্পিউটার গিক এর কথা চিন্তা করলে আমাদের চোখের সামনে যে ছবি ভেসে উঠে, অ্যারন তেমনই এক ছেলে। তিন ভাইয়ের মাঝে মেঝ অ্যারন ছিলো ছোটবেল থাকেই প্রচন্ড রকমের কৌতুহলী। তার সাথে কম্পিউটারের প্রথম পরিচয় ঘটে ০৩ বছর বয়সে। তার বড় ভাইয়ের মতে, তাদের বাসার সবার জন্য একটা করে কম্পিউটার ছিলো কিন্তু অ্যারনের মত কম্পিউটার ভক্ত কেউ ছিলো না। অ্যারন সবসময়ই কম্পিউটার দিয়ে করার মত কিছু না কিছু খুঁজে পেত। কিছুদিনের মাঝেই সে ইন্টারনেটের ভক্ত হয়ে যায়। ছোট থাকতেই সে আর তার ছোট ভাই মিলে বেসিক ল্যাঙ্গুয়েজে Star wars নিয়ে একটা গেম বানিয়েছিলো নিজেরা খেলার জন্য !

aaron

অ্যারন তার ম্যাকিন্টোশ কম্পিউটার আর আর একটা কার্ডবোর্ড বক্স ব্যবহার করে নিজে নিজেই একটা ATM বানিয়ে ফেলেছিলো !

aaron
তবে অ্যারনের একটা অনন্য গুণ ছিলো। সে যাই শিখতো তাই সে সবার সাথে শেয়ার করতে চাইত। স্কুলে প্রথম যেদিন সে অ্যালজেবরা শিখেছিলো সেদিন সে বাসায় ফিরে এসে তার ভাইদেরকে অ্যালজেবরা শিখালো ।  তার এই শেয়ার করার মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় ওয়েবসাইট “Info Base”। এই সাইটে যে কেউ চাইলে যেকোন কিছু সম্পর্কে রেফারেন্স সহ তথ্য শেয়ার করতে পারত। কনসেপ্টটা উইকিপিডিয়ার মত হলেও তখনও উইকিপিডিয়ার জন্ম হয় নি। তাই এই সাইটকে উইকিপিডিয়ার পূর্বপুরুষ বলা চলে। এই সাইটটি স্কুলের বাচ্চাদের জন্য কেম্ব্রিজের একটা সফটওয়ার ফার্ম এর দেওয়া Arts Digita পুরষ্কার জিতে নেয়। এবং তখন অ্যারনের বয়স ছিলো মাত্র ১২ !

এখানে একটা পয়েন্ট উল্লেখ করা ভালো, অ্যারন এবং আমাদের আজকের World Wide Web প্রায় সমবয়সী। (অ্যারনের জন্ম-১৯৮৬, ওয়েবের জন্ম- ১৯৮৯) তাই প্রোগ্রামার/ইন্টারনেট অ্যাক্টিভিস্ট অ্যারনের বেড়ে উঠায় ইন্টারনেটের যেমন অবদান তেমনি ইন্টারনেটকে আজকের এই অবস্থায় নিয়ে আসার পিছনে অ্যারনেরও একই অবদান ।  কথাটা শুনতে একটু আশ্চর্য লাগলেও আসল ঘটনা তা-ই। তবে ওয়েবের জনক হিসেবে টিম বার্নার্স লী খ্যাতি পেলেও অ্যারনের কথা তেমন একটা শোনা যায় না, কারণ এই ছেলেটা পরিণত হবার আগেই যে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে !

InfoBase এ সাফল্য পাবার পর থেকেই অ্যারন বিভিন্ন প্রোগ্রামিং মিটআপে যাওয়া শুরু করে। ১৪ বছর বয়সে সে প্রোগ্রামিং কমিউনিটিতে সাড়া ফেলে RSS এর ধারণা প্রস্তাব করার মাধ্যমে । সহজ ভাষায়, RSS (RDF (Resource Description Framework) Site Summary) হচ্ছে একটা ওয়েবপেজের সারাংশ বের করার ফ্রেমওয়ার্ক। ধরা যাক, কেউ একজন দোয়েল পাখি নিয়ে ব্লগ লিখলো। আরেকজন আবার অন্য কোন সাইটে পানকৌড়ি নিয়ে লিখল, কেউ হয়তো লিখলো সাদা বক নিয়ে। এখন আমি যদি এমন একটা সাইট বানাতে চাই যেখানে শুধু পাখি নিয়ে লেখা থাকবে তবে আমি চাইলে অন্যান্য সাইটে পাখি নিয়ে থাকা সব লেখার সারাংশ RSS ফিডের মাধ্যমে আমার সাইটে যোগ করে দিতে পারি।  This is called the connectivity of same type information that are floating around the web.

Rss

RSS এর ধারণা নিয়ে আসার পুরো সময়টাতে অনেকেই অ্যারনকে চিনত একজন প্রতিভাবান প্রোগ্রামার যে একটা অসাধারণ আইডিয়া নিয়ে কাজ করছে। যারা অ্যারনের সাথে RSS ফিড নিয়ে কাজ করেছিলো তারা কেউই অ্যারনকে সামনাসামনি দেখেনি। RSS এর কাজ শেষের পর যখন তারা অ্যারনের সাথে দেখা করতে চায়, তখনই তারা আবিষ্কার করে যে তারা আসলে একটা ১৪ বছরের ছেলের সাথে এতদিন কাজ করেছে ! তখন এটা ছিলো Talk of the community। অ্যারনের হিরো অর্থাৎ যার কাজ অ্যারনকে অনুপ্রেরণা দিতো বেশি সেই টিম বার্নাস লী স্বেচ্ছায় অ্যারনের সাথে দেখা করে তাকে RSS ফিড তৈরির জন্য অভিবাদন জানান।

এসবই অ্যারনের একাডেমিক পড়াশুনার বাইরের অ্যাক্টিভিটি। RSS ফিডের সাফল্যের সময় অ্যারন হাইস্কুলে ভর্তি হয়। যথারীতি প্রথাগত পড়াশুনার প্রতি তার বিরক্তি চলে আসে। তার মতে, জ্যামিতি যেহেতু সে বই পড়েই শিখতে পারছে তাহলে তার ক্লাস করার কী দরকার ! আর অ্যারনের একটাই কথা, তার ইতিহাস, সমাজ এসব শেখার কোন ইচ্ছা নেই। তার আগ্রহ শুধু ওয়েব নিয়ে। নিজের শেখার ইচ্ছা আর শিক্ষাব্যবস্থার পারষ্পরিক সংঘাতই অ্যারনকে শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে। সে লাইব্রেরীতে ঘণ্টার পর ঘন্টা পরে থেকে শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস সম্পর্কে পড়তে থাকে। তার মাঝে Activist সত্তাটা গড়ে উঠতে থাকে। জন্মগতভাবে পাওয়া শেয়ার করার মানসিকতার কারণে সে “মুক্ত জ্ঞান” আন্দোলনে জড়িয়ে পরতে থাকে।

Lawrence Lessigname হার্ভার্ড ল’ স্কুলের একজন প্রফেসর তখন আমেরিকার নতুন পাইরেসী আইনের বিরুদ্ধে আইনী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। মুক্ত জ্ঞান এবং সাথে সাথে কপিরাইট রক্ষার স্বার্থে তিনি তখন সরকারের পাইরেসী আইনের বিকল্প হিসেবে Creative Common (CC) নামে একটা আইডিয়া নিয়ে আসেন। ওয়াশিংটন আদালতে যখন এই নিয়ে শুনানী চলছিলো তখন কিশোর অ্যারন শিকাগো থেকে শুধু শুনানী শোনার জন্য সেখানে চলে যায়। প্রফেসর লেসিগের সাথে সেবারই প্রথম অ্যারনের সাক্ষাৎ হয় ।

aron

Lessig যখন অ্যারনের সাথে CC এর মুলনীতি কেমন হবে তা নিয়ে কথা বলছিলেন, তখন অনেকেই লেসিগকে জিজ্ঞেস করেছিলেন – আপনি কেন একটা ১৫ বছরের বাচ্চার কাছ থেকে এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন ? Isn’t it a mistake? লেসিগের উত্তর ছিলো, “The biggest mistake would be not listening to this kid.” CC এর গুরুত্ব এক কথায় বলে বোঝানো সম্ভব না। শুধু একটা উদাহরণ এখানে টানা যায়, আমরা ফটোগ্রাফীর বিখ্যাত ওয়েবসাইট Flicker এর সাথে সবাই পরিচিত। Flicker এর সম্পূর্ণ কাঠামোটাই গড়ে উঠেছে CC এর মুলনীতি এর উপর ভিত্তি করে। এতে একদিকে শিল্পীর অধিকার যেমন রক্ষা হচ্ছে তেমনি তথ্যও সবার জন্য উন্মুক্ত থাকছে।  যদিও CC প্রতিষ্ঠায় অ্যারনের অবদান ছিলো শুধুই টেকনিক্যাল, কিন্তু অ্যারনের কাছে “মুক্ত জ্ঞান” সম্পর্কিত যেকোন কিছুর মুল্য ছিলো অনেক বেশি।

অ্যারনের জীবন দর্শন সম্পর্কে লেসিগকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি অ্যারনের ব্যক্তিগত ব্লগ থেকে কিছু লাইন তুলে ধরেন-

I think deeply about things and want others to do likewise. I work for ideas and learn from people. I don’t like excluding people. I am a perfectionist. But i won’t let that get in the way of publication. Except for education and entertainment, I am not going to waste my time on things that won’t have an impact. I try to be friends with everyone but hate when you don’t take me seriously. I don’t hold grudges. It’s not productive. But i learn from my experience. I want to make the world a better place.


১৮ বছর বয়সে অ্যারন ষ্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এবং অবশ্যই সে ০১ বছর পর ড্রপ আউট হয়। সে তখন Paul Graham এর সাথে মিলে Y Combinator প্রতিষ্ঠায় কাজ করা শুরু করে। Y combinator এর ভিত্তি হিসেবে অ্যারন Infogami নামে একটা ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করে খুব সহজে ওয়েবসাইট তৈরি করার জন্য। কিন্তু Infogami তেমন সাফল্য না পাওয়ায় অ্যারন Steve Huffman এবং Alexis Ohanian এর সাথে যোগ দেয়। যারা পরবর্তীতে reddit.com প্রতিষ্ঠা করে। রেডিট প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অ্যারনের বক্তব্য হচ্ছে, সবচেয়ে কম কোডিং করে দাড় করানো একটা ওয়েবসাইট যা কিনা হাজার হাজার মানুষ ব্যবহার করে। আমরা হাল আমলে যে ফেসবুক কিংবা quora ব্যবহার করি, reddit হচ্ছে তার সবকিছুর জনক। এমনও মানুষ আছে, যারা প্রতিদিন সকালে উঠেই প্রথম যে কাজটা করে তা হচ্ছে reddit.com চেক করা  ! reddit কেমন সাইট তার একটা উদাহরণ দেওয়া যায় এভাবে- আমরা ফেসবুকে যে Trolling করি, সেই Trolling এর প্রথম ঘটনা ঘটে reddit এ।

troll

 

reddit.com এর সাফল্য দেখে কর্পোরেট ম্যাগাজিন Conde Nast  সাইটটা প্রতিষ্ঠাতাদের কাছ থেকে ১+ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়। তখন অ্যারনের বয়স ছিলো ১৯! কিন্তু অ্যারনের কাছে টাকার প্রতি তেমন কোন আকর্ষণই ছিলো না। প্রয়োজনীয় জিনিস বাদে কোন কিছু কেনাটা তার কাছে ছিলো বিরক্তিকর একটা ব্যাপার। তার ধ্যান আর জ্ঞান বলতে ছিলো শুধু “ওয়েব”।

reddit.com বিক্রীর পর অ্যারন বেশিদিন আর সেখানে কাজ করতে পারেনি। বাধাধরা নিয়ম তার ভালো লাগত না। প্রথমদিন থেকেই সে  অফিস সম্পর্কে অভিযোগ জানানো শুরু করল। সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো সে। সবাই জানতে চাইত, অ্যারন এত অল্প সময়ে এত কিছু করে কিভাবে ! কিন্তু অফিসের নিয়মকানুনও তার উপর চাপিয়ে দিত। অফিসের পিসিতে অ্যারন নিজের ইচ্ছামত সফটওয়ার ইনষ্টল করতে পারত না।  অফিসের কাজ ফাঁকি দিয়ে অনলাইন গেম খেলা সে পছন্দ করত না। কাজের পদ্ধতিসহ এসব জিনিস না মেলায় অ্যারনের নিজেকে বন্দী মনে হত। তাই একসময় সে reddit.com এর অফিসে যাওয়া কমিয়ে দেয় । এবং একসময় চাকরী থেকে বরখাস্ত হয়।

Fired

অ্যারন এরপর আর কোনদিন কর্পোরেট জবে ফিরে যায় নি। এমনকি যে startup idea এর কারণে অ্যারন বিখ্যাত হয়েছিলো সে পথে সে আর কোনদিন হাঁটে নি।  অ্যারনের জীবনের ২য় এবং সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় শুরু হয় এখানেই।

Pacer হচ্ছে আমেরিকার কোর্ট ডকুমেন্ট সমৃদ্ধ একটা সাইট। এই সাইটে আমেরিকার যত পাবলিক কেস হয়েছে তার ডকুমেন্ট রাখা আছে। এখন সাইট টা অনেক গোছানো হলেও শুরুতে এটার অবস্থা খুব একটা ভালো ছিলো না। সহজে কোন ডকুমেন্ট খুঁজে পাওয়া যেত না। আর সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে, এখান থেকে ডকুমেন্ট দেখতে চাইলে টাকা দিতে হত। অথচ আমেরিকার e-government act’2002 মতে একমাত্র অতিরিক্ত ডকুমেন্টের জন্যই টাকা চার্জ করা বৈধ ছিলো। অবস্থা ছিলো এমন যে, একজন গরীব আইনের ছাত্র কিংবা ক্লায়েন্ট বা আইনজীবী এর পক্ষে প্রয়োজনীয় ডাটা পাওয়াটা অনেক কঠিন ছিলো। Carl Malamud নামে এক ব্যক্তি তার Public.resource.org সাইটের মাঝে এগিয়ে আসেন এই সমস্যার একটা সমাধান করার জন্য। তিনি সবার কাছে অনুরোধ করেন, যারা নিজ খরচায় Pacer থেকে ডকুমেন্ট নামাবে তারা যেন সেই ডকুমেন্টটা তার সাইটে আপলোড করে দেয়। অথবা তিনি আরেকটা অপশন দেন, কেস ফাইলগুলোর যে লাইব্রেরী আছে ৩টা ভিন্ন ভিন্ন ষ্টেটে, সেসব লাইব্রেরীতে গেলে সেখান থেকেও চাইলে যে কেউ ডকুমেন্ট আপলোড করতে পারেন। কার্লের কাছে ব্যাপারটা অত সিরিয়াস ছিলো না। তার মতে, এটা অনেকটা আন্দাজে ঢিল দেওয়ার মত। কাজ হলে ভালো, না হলেও ক্ষতি নেই।  কিন্তু অ্যারনের কাছে এর গুরুত্ব ছিলো। সে অফিসিয়ালী কার্লের সাথে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো pacer সিষ্টেমের বেনিফিট হিসেবে সরকার প্রতি বছর ১২০ মিলিয়ন ডলার জনগণের কাছ থেকে নিয়ে নিত।

Law is the operating system of our democracy and you have to pay to see it! That’s not much of a democracy- TIM O’Reilly, Founder of O’Reilly Media Inc.

লাইব্রেরী থেকে ডকুমেন্ট ডাউনলোড করার জন্য যে কোড ব্যবহার করা হচ্ছিল অ্যারন একদিন Public Resouce এর মিটিং এ তার access পায়। সে তখন সেই কোডের কিছু পরিবর্তন-পরিমার্জন করে তার এক বন্ধুকে দিয়ে কাছের কেস লাইব্রেরীতে পাঠায়। কোর্টের লোকেরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করে যে, তাদের সাইট থেকে massively ডাটা ডাউনলোড হচ্ছে। কয়েক মিনিটের মাঝে  প্রায় ২০ মিলিয়নে (!!) পেজ ডকুমেন্ট ডাউনলোড হয়ে যায় এবং ফ্রীতে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয়। কার্লের মতে এটা তাদের expectation কে ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। এই ঘটনা অ্যারনের অর্জনের মুকুটে যেমন একটি পালক যোগ করে তেমনি তাকে FBI এর নজরে নিয়ে আসে। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে FBI অ্যারনের বিরুদ্ধে কোন চার্জ আনতে পারেনি। এবং এই ঘটনার প্রেক্ষিতে কোর্ট ডকুমেন্ট পাবলিকলী access দেওয়ার আইনেও পরিবর্তন আসে।

doc

অ্যারন ধীরে ধীরে রাজনীতিতেও আগ্রহী হতে থাকে। ডেমোক্রেটিক পার্টির অফিসে থাকা তার এক বন্ধুর মাধ্যমে সে আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাস, ঐতিহ্য নিয়ে শিখতে শুরু করে। কিন্তু একাডেমিক জ্ঞানের প্রতি তার আগ্রহে কখনও ভাটা পড়েনি। বরং এবার তার নতুন একটা বিষয় চোখে পরে।

পৃথিবীতে যত সায়েন্টিফিক জার্নাল বের হয় তা প্রতিটা প্রসেস থাকে পাবলিক। বলা হয়, এই গবেষনার ফলে মানুষের অনেক উপকার হবে। কিন্তু গবেষনা শেষে ঠিকই তা কর্পোরেটদের হাতে চলে যায়। যে কেউ চাইলেই আর সেই জার্নাল পড়তে পারে না। তাকে pacer এর মতই টাকা খরচ করতে হয়। অ্যারন এই জিনিসটা খেয়াল করে আগের মতই কোন সমাধানে আসা যায় কিনা ভাবতে থাকে। এই পুরা সিষ্টেমটা তৈরির পিছনে অনেকের হাত থাকলেও অ্যারন Jstor কে টার্গেট করে। অ্যারন Jstor এর কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চায়, Jstor কে সবার জন্য খুলে দিতে চাইলে কত টাকা খরচ হবে। তাদের উত্তর ছিলো, ২০০ মিলিয়ন ডলার !

অ্যারন Jstor থেকে massive ডাটা ডাউনলোডের সিদ্ধান্ত নেয়। MIT এর নেটওয়ার্কের কাছে Jstor এর বই এবং জার্নালের ফ্রী access ছিলো। তাই অ্যারন একটা নতুন ল্যাপটপ কিনে MIT নেটওয়ার্কে রেজিষ্টার করে  Jstor এর নেটওয়ার্কে ঢুকে। সে পাইথন দিয়ে keep_grabbing.py নামে একটা কোড ফাইল তৈরি করে যার কাজ হচ্ছে Jstor থেকে ডাটা grab করা। কোড রান করার কিছুক্ষণের মধ্যেই Jstor থেকে দ্রুতগতিতে ডাটা ডাউনলোড হতে থাকে।  Jstor, MIT আর অ্যারনের মাঝে ইদুর-বিড়াল যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। অবশ্যই অ্যারন এই যুদ্ধে জয়ী হয়, কারণ অ্যারনের টেকনিক্যাল স্কিল Jstor কিংবা MIT এর যেকোন টেকনিক্যাল প্রফেশনালের চেয়ে যথেষ্ট বেশিই ছিলো !

কিন্তু এখানে MIT একটা নোংরা গেম খেলে। অ্যারন MIT এর বেসমেন্টের একটা রুমে কিছু এক্সটার্নাল হার্ডডিস্ক সহ তার ল্যাপটপ রেখে চলে গিয়েছিলো পুর্ণ্যদমে ডাউনলোড হওয়ার জন্য। অ্যারন না থাকা অবস্থায় MIT কর্তৃপক্ষ ল্যাপটপটি খুঁজে পায়। তারা ল্যাপটপট না সরিয়ে কিংবা কানেকশন না বন্ধ করে সেখানে surveillance ক্যামের বসায়। তারা চাইলেই ল্যাপটপের মালিককে ট্রেস করে অ্যারনকে খুঁজে পেতে পারত। কিন্তু তারা তা না করে ঘটনার ডকুমেন্ট রাখতে চেয়েছিলো যাতে পরবর্তীতে কোর্টে কেস করতে পারে ! কয়েকদিন পর অ্যারন যখন হার্ডডিস্ক পরিবর্তন করে বাসায় ফিরে যাচ্ছিলো তখন তাকে পুলিশ অ্যারেষ্ট করে।

hac

তখন  ৯/১১ এর উত্তাল সময়। প্রেসিডেন্ট বুশ Electronic Crimes Task Force গঠন করেছে। এই Secret Service Task ফোর্স অ্যারনের কেসটা নিজেদের হাতে তুলে নেয়। তারা বোষ্টনের অ্যাটর্নী অফিসে অ্যারনের কেসকে চালান করে দেয়। সাধারণ মানুষ অ্যারনের পক্ষে বিক্ষোভে ফেটে পরে।  অ্যারনের বিচারের দায়িত্ব যে অ্যাটর্নী জেনারেলের হাতে পরে তিনি সে সময় আমেরিকার কুখ্যাত হ্যাকার আলবার্টো গনজালেস কে উল্লেখ করে টেলিভিশনে সাক্ষাতকার দেন । বোঝাই যাচ্ছিলো, তারা অ্যারনকে আর পাঁচটা সাধারণ হ্যাকার যারা টাকার জন্য কোন সিষ্টেমে হ্যাক করে ঢুকত, তাদের সাথে তুলনা করছে।

এসব কিছুই অ্যারনের উপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে। যেখানে প্রতিযোগিতা চলছিলো Jstor, MIT আর অ্যারনের মাঝে, সেখানে আমেরিকার ক্রিমিনাল সিষ্টেম অযাচিতভাবে ঢুকে পরে। অবশ্যই অ্যারন আর গনজালেসের কাজকে কখনই একই মাপকাঠিতে মাপা যায় না। অ্যারনের বিরুদ্ধে সরকার রায় দেয় যে, সে ১ বছর Home Detention এ থাকবে  এবং কোন ধরনের computer ব্যবহার করতে পারবে না ! এর জন্য অ্যারনকে শুধু এমন একটা অপরাধের কথা স্বীকার করে নিতে হবে যা আসলে সে করে নি ! অ্যারন এর আগেও অনেক বড় বড় ডাটাবেজ হ্যাক করেছিলো শুধু মাত্র প্রজেক্টের কাজে। এসব ডাটা সে কখনই সে পাবলিকলী পাবলিশ করে নি।

অ্যারন jstor হ্যাকের আগে একটা সেমিনারে উল্লেখ করেছিলো, সায়েন্টিফিক জার্নাল সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা উচিত। উন্নত দেশে থাকা একজন ছাত্রের পক্ষে টাকা দিয়ে এটা দেখা সম্ভব হলেও ভারতের মত দেশগুলোতে অনেক ছাত্রের পক্ষে তা দেখা সম্ভব হবে না। এটা জ্ঞানচর্চার আসল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।

মাসের পর মাস এই মামলার কাজ চলতে থাকে। এর মাঝে অ্যারন ইন্টারনেট অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে মিডিয়াতে জনপ্রিয় হয়ে উঠে।

activist

জুলাই ১৪, ২০১১ এ অ্যারন কে Jstor কেসে প্রায় ৪ টা কারণ দেখিয়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাকে ১ মিলিয়ন ডলার জরিমানা অনাদায়ে ৩৫ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে অ্যারন ১ লাখ ডলার শোধ করে জামিন পায়। যদিও Jstor নিজে থেকে অ্যারনের উপর থেকে তাদের চার্জ তুলে নেয় কিন্তু তারা অ্যারনের পক্ষে কিছু বলা থেকে বিরত থাকে। তাদের মতে, It is government’s decision, not Jstor’s.

অ্যারনের অভিভাবকরা Jstor এর এই statement ব্যবহার করে সরকারকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানায়। কিন্তু সরকার রাজী হয় নি। They want to make an example out of it !
এই সময়ে MIT এর ভুমিকাও বেশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তারা অ্যারনের পক্ষে কোন কথাতো বলেই নি, বরং তারা অফিসিয়ালী নিরপেক্ষ থাকার Statement প্রকাশ করে!

অ্যারনের বাবার ভাষ্যমতে,

If you look at the Steve Jobs and Steve Wozniak, they started selling a blue box which they design to defraud the phone companies. If you look at Bill Gates and Ben Cohel, they initially started their business by using Computer Lab at Harvard, which is pretty against the rule. The difference between Aaron and  the people i just mentioned is that Aaron want to make the world a better place instead of just making money.

এইদিকে অ্যারনের পলিটিক্যাল একটিভিজম চলতে থাকে। আমেরিকার নতুন আইন SOPA (Stop Online Piracy Act) এর বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন চালানোর জন্য সে Demand Progress নামের একটা সংগঠন গঠন করেন।

act

সচেতন মানুষরা সবাই প্রতিবাদ করা শুরু করে। অ্যারন ছিলো এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। অ্যারনের অসাধারণ টেকনোলজিকাল ক্ষমতা তার জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট ছিলো। সিনেটের সদস্যরা তাদের এই আন্দোলনকে Nerd (সোজা বাংলায় ‘আঁতেল’) দের আন্দোলন বলে ঠাট্টা করলেও একসময় তারা আন্দোলনকারীদের দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয়।

sopa

sp

আন্দোলনের পর পরই অ্যারন গ্রেফতার হয়।

crop

Prosecution Panel অ্যারনের বিরুদ্ধে আরও ৯টি (আগের ৪ টিসহ ১৩টি) অভিযোগ আনে। এর মাঝে ১১টাই ছিলো Computer Fraud এবং abuse act এর উপর ভিত্তি করে, যা কিনা ক্ষতিকর হ্যাকিং act এর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। অ্যারনের উপর মানসিক চাপ আরও বাড়তে থাকে। তার মনে দুশ্চিন্তা হতে থাকে, এবারের রায়ে যদি আরও জরিমানা করা হয় তবে তার পরিবার কিভাবে সেই টাকা শোধ করবে ! কিন্তু অ্যারন কখনই তার উপর চাপানো দোষ স্বীকার করে নেয় নি।

জানুয়ারী ১১, ২০১৩ এ অ্যারন তার নিজের অ্যাপার্টমেন্টে আত্নহত্যা করে।

last

 

সূত্রঃ

১) The Internet’s Own Boy: The Story of Aaron Swartz

২) http://www.aaronsw.com

৩)  http://www.rememberaaronsw.com/memories

৪) Aaron Swartz: hacker, genius… martyr?

N.B: আমার এই লেখাটি আমার অনুমতি ব্যতীত অন্য কোথাও ব্যবহার করা যাবে না।

Md. Noor Faizur Reza
Author: Md. Noor Faizur Reza

আমার যে কাজ ভালো লাগে তা নিয়ে সারাদিন পরে থাকি !

Permanent link to this article: https://www.borgomul.com/rezanur/2985/


মন্তব্য করুন আপনার ফেসবুক প্রোফাইল ব্যবহার করে

2 comments

  1. ভাই, আপনি বায়োগ্রাফি অনেক ভালো লিখেন।

    1. ধন্যবাদ চন্দ্র। আমি এভাবে অবশ্য ভেবে দেখিনি ব্যাপারটা। লেখাটা লিখার সময় ভালোই উপভোগ করেছি। এমন যদি হয় তবে বায়োগ্রাফী লেখার কোন পার্টটাইম চাকরী করতে পারলে খুশি হতাম।

মন্তব্য করুন

Discover more from বর্গমূল | Borgomul

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading