অয়েলারঃ জিনিয়াসদের জিনিয়াস

ক্লাস নাইনের ঘটনা- হাইয়ার ম্যাথ বই পড়তে গিয়ে ৫.১ অনুশীলনে ফাংশন নামে একটা জিনিস পাইলাম, যতই বুঝার চেষ্টা করি কোন কূলকিনারা করতে পারি না। সবাই বুঝে আমি বুঝি না! কষ্টের কথা কাউরে বলতেও পারি না। স্কুল-কলেজ দুটাই পার করলাম কোনটা এক-এক ফাংশন, কোনটা এক-এক না বুঝতে বুঝতে। ফাংশন কি জিনিস জানি না কিন্তু এক-এক প্রমান করতে পারি-এতবড় জিনিয়াস আমি!!! ভার্সিটিতে ভর্তি হইলাম কিন্তু ফাংশন পিছু ছাড়ে না, তার উপর আবার গ্রাফ আঁক!  ফাংশন দিয়ে কি হয়? ফাংশন কি কাজে লাগে?এই ফাংশন জিনিসটা বের করেছে কে?  অনেকগুলি প্রশ্ন নিয়ে মাঠে নামলাম-উপায় ত আর নাই! আবিস্কারকর্তার নাম লিওনার্দ অয়েলার(১৭০৭-১৭৮৩) । 

ফাংশন কি,এর বেসিক কনসেপ্ট, সিম্বল f(x)- এসবের ধারনা আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগেই তিনি দিয়ে গেছেন । শুধু তাই নয়, পাই, কাল্পনিক সংখ্যা ‘ i ‘ , যোগফল প্রকাশক সিগমা এই চিহ্নগুলো তিনিই ব্যবহার করা শুরু করেছিলেন । এছাড়া ‘e’ বেইজড লগারিদম যাকে আমরা ছোটবেলায় স্বাভাবিক লগারিদম পরেছি, সেটার e কনসেপ্টও তারই উদ্ভাবন করা । মোদ্দাকথা আমরা কলেজ পর্যন্ত গণিত বলতে যা শিখি তার বেশিরভাগই অয়েলারের উদ্ভাবন। অয়েলারের সম্পর্কে গনিতবিদ ল্যাপ্লাস তার ছাত্রদের বলতেন, “Liesez Euler, Liesez Euler, c’est notre maître à tous” (“Read Euler, read Euler, he is our master in everything” (Beckmann 1971, p. 153)।

সুইজারল্যান্ডের বাসেল শহরে জন্ম নেয়া এই গনিতবিদ মাত্র ১৬ বছর বয়সে আর্টসে স্নাতক এবং দর্শনে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং সেই বয়সেই তিনি প্রখ্যাত গনিতবিদ জোহান বার্নালির কাছে প্রতি সপ্তাহের শনিবার দীক্ষা নিতেন। এরপর বাবার ইচ্ছায় অয়েলার থিওলজি নিয়ে পড়ালেখা শুরু করেন । এর মাঝে তার গণিত নিয়ে গবেষণা চলতে থাকে ।

১৭৩৫ সালে তিনি নাম্বার থিউরি বিখ্যাত বাসেল প্রEuler poster 500বলেম সমাধান করেন ।এই সমাধান তাকে বিশাল খ্যাতি এনে দেয় । এছাড়া ১৭৩৬ সালে তিনি The Königsberg Bridge Problem সমাধান করেন । সমস্যাটি এরকম-‘ একটি শহরের মধ্য দিয়ে সাতটি ব্রিজ আছে । প্রতিটি ব্রিজ দিয়ে একবার এবং কেবলমাত্র একবার গিয়ে পুরো শহরটি ঘুরে আসতে হবে ।’ অয়েলার সমস্যাটির একটি ডায়াগ্রাম তৈরি করে দেখান যে প্রতিটি ব্রিজ দিয়ে কেবলমাত্র একবার গিয়ে পুরো শহর প্রদক্ষিণ করা আসলে সম্ভব নয়(বিস্তারিত হাইপারলিঙ্কে বলা আছে)।

এই সাত ব্রিজ সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে তিনি সম্পূর্ণ নতুন থিউরি দেন যাকে আমরা গ্রাফ থিউরি নামে চিনি। গণিত ছাড়াও কমপিউটার সাইন্স, পদার্থবিদ্যা, রসায়নসহ বিজ্ঞানের অনেক শাখায় গ্রাফ থিউরির ব্যবহার রয়েছে । আধুনিক ওয়েবপেজ ব্যবস্থাপনাও গ্রাফ থিউরির অবদান । এই গ্রাফ থিউরি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি  টপলজি নামের গনিতের নতুন শাখা খোলেন । অয়েলারই একমাত্র গনিতবিদ যার নামে দুটি সংখ্যা আছে- একটি অয়েলার নাম্বার e,( আসন্ন মান ২.৭১৮২8) আরেকটি Euler-Mascheroni Constant γ (গামা, আসন্ন মান ০.৫৭৭২১ ) । আহ্নিক গতি, বিদ্যুতবিদ্যা, চৌম্বকবিদ্যা, চাঁদের গতিবেগ , বিছিন্ন গণিত, নিউম্যারিকাল মেথড, কমপ্লেক্স এনালাইসিস, এমনকি অ্যাপ্লাইড ম্যাথমেটিক্স- গনিতের কোথায় তার অবদান নেই ? বাস্তব জীবনে বার্নালি নাম্বার, ফুরিয়ার সিরিজ, ভেন ডায়াগ্রাম, অয়েলার নাম্বারের বিভিন্ন ব্যবহার, লিবনিজের ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস আর নিউটনের ফ্লাক্সন মেথডের সমন্বয় করে তিনি দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা সমাধানে ক্যালকুলাস ব্যবহারের ক্ষেত্র উন্মোচন করেন ।432px-Methodus_inveniendi_-_Leonhard_Euler_-_1744

জীবদ্দশায় অয়েলার সেইন্ট পিটার্সবার্গ একাডেমী অফ সাইন্স, ইউনিভার্সিটি অফ বাসেল ও বার্লিন একাডেমী অফ সাইন্সে শিক্ষাকতা করেন । এই সময়ে তিনি প্রায় ৮০০’র মত লেখা লেখেন । তবে তার বেশিরভাগ লেখাই হারিয়ে গেছে । তিনি ১২ বার প্যারিস একাডেমী প্রাইজ পেয়েছিলেন। দুঃখের কথা, জীবনের শেষ ১৭ বছর তিনি অন্ধ ছিলেন তথাপি এই সময়কে তার প্রতিভার সবচাইতে উৎকর্ষকাল ধরা হয় । অসাধারন স্মৃতিশক্তির অধিকারি অয়েলার ৭০ বছর বয়সেও ভার্জিলের ৯৮৯৬ লাইনের কবিতা Aeneid নির্ভুলভাবে বলতে পারতেন । এমনকি কাগজ-কলম ছাড়াই অনেক জটিল Euler's_formula.svgক্যালকুলেশন তিনি মুখেই বলে দিতে পারতেন!!!

১৭৪৮ সালে ফাংশনের উপর লেখা ‘Introductio in analysin infinitorum’ এবং ১৭৫৫ সালে ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস নিয়ে ‘Institutiones calculi differentialis’ নামে আরেকটি গ্রন্থ বের করেন । এছাড়া ‘Natural Philosophy Addressed to a German Princess’ নামে তার ২০০টি চিঠির একটি সংকলন রয়েছে ।  ‘Tentamen novae theoriae musicae‘ নামে মিউজিকাল থিউরির উপরও তার একটি বই রয়েছে।

ফাংশন কি জিনিস খুজতে দেখলাম গণিত খুজতে গেলে অয়েলার নামটি সামনে আসবেই । কোন এক জায়গায় পরেছিলাম,’While Gauss is considered as the Prince of Mathematics, Leonhard Euler is hailed as the King of Mathematics’ । এখন বুঝি ম্যাথম্যাটিকস যদি কোন ফাংশন হয়, তার ডোমেন যাই হোক রেঞ্জ অবশ্যই অয়েলার।

তথ্যসূত্র ঃLeonhard-Eular-Quotes-5

উইকিপিডিয়া

http://scienceworld.wolfram.com/biography/Euler.html

http://www.therichest.com/rich-list/most-influential/greatest-mathematicians/

http://fabpedigree.com/james/mathmen.htm#Euler

http://nrich.maths.org/2484

 

Permanent link to this article: https://www.borgomul.com/fahim/1310/


মন্তব্য করুন আপনার ফেসবুক প্রোফাইল ব্যবহার করে

3 comments

  1. চমৎকার। 🙂
    নিচের লিংকটায় গেলে অয়লারের বিশালত্ব নিয়ে একটু ধারনা পাওয়া যায়।
    http://en.wikipedia.org/wiki/List_of_topics_named_after_Leonhard_Euler

    1. ধন্যবাদ ভাই । আসলে ছোট্ট একটা লেখায় অয়েলারকে দেখানো খুবই কঠিন। মানুষটার কাজের ক্ষেত্র এতই বিশাল,তাকে নিয়ে লেখতে গেলে অনায়াসে ১০০০-২০০০ পৃষ্ঠার বই বের করা সম্ভব ।

  2. besh valo lekha……….

মন্তব্য করুন

Discover more from বর্গমূল | Borgomul

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading