আমেরিকায় লেখাপড়াঃ কেমন ছিল প্রথম সেমিস্টার

দেখতে দেখতে প্রথম সেমিস্টার হয়ে গেল। কেমন ছিল আমার প্রথম সেমিস্টারের পড়াশোনার চাপ। আর এই চাপ আমার পরীক্ষার ফলাফলে কতটা ইফেক্ট ফেলেছে। এটা নিয়েই লিখছি। গত ১০ই ডিসেম্বর থেকে ১৪ই ডিসেম্বর ছিল ফাইনাল উইক। তার আগের সপ্তাহেই সব ক্লাস শেষ হয়ে গিয়েছিল। ফাইনাল উইকে শুধু পরীক্ষা আর পরীক্ষা। আমার ১০ তারিখে, ১৩ আর ১৪ তারিখে একটা করে পরীক্ষা হয়েছে। মজাটা হলো সবগুলোর সম্মিলিত ফলাফল পেয়েছি মাত্র ২দিন পরে ১৬ তারিখ রাতের মধ্যে। মনে আছে দেশে একবার ফাইনালের রেজাল্ট পেয়েছিলাম ৮ মাস পর। মজা না?

সেমিস্টার শুরু হয়েছিল আগস্টের ২৭ তারিখে। কম্পিউটেশনাল অপশন নিয়েছি। গণিতের ৩ টা কোর্সঃ নিউমেরিক্যাল ১ ও ২, অপারেশন রিসার্চ। কম্পিউটার সায়েন্সের ৩ টা কোর্সঃ এনালাইসিস অব এলগরিদম ও এই ডিপার্ট্মেন্টের বাকী যেকোন দুইটা কোর্স।  এবং স্ট্যাটের ১ টা কোর্সঃ স্ট্যাটিসটিক্যাল মেথড – ১। এই কোর্সগুলো আমাকে মাস্ট নিতে হবে। এছাড়া থিসিস এবং আর যেকোন আরেকটি কোর্স কমপ্লিট করলেই আমাকে মাস্টার্স দিয়ে দিবে। আমি এই সেমিস্টারে নিয়েছিলাম স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেথড, ডাটা মাইনিং আর এনালাইসিস অব এলগরিদম।

প্রথম ১/২ সপ্তাহ খুব চিল মুডে ছিলাম। কোন হোমওয়ার্ক নাই। টিচিং ডিউটি নাই। পড়াশোনাও কঠিন লাগে না। সবই ব্যাসিক। তারপর শুরু হলো চাপ। স্ট্যাটে ক্যামনে ক্যামনে যেন প্রথম ৪ অধ্যায় শেষ করে ফেলল দুই সপ্তাহে। দিয়ে দিল হোমওয়ার্ক। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে R-প্রোগ্রামিং শিখিয়েছে কোর্সের ম্যাম। হোমওয়ার্ক ওইটা দিয়েই সমাধান করতে হয়েছে। এদিকে এই দুই সপ্তাহে এলগরিদম ক্লাসে শুধু কয়েকটা সর্টিং এলগরিদম এবং এগুলোর টাইম কমপ্লেক্সিটি আর টাইম কমপ্লেক্সিটি নিয়ে কিছু থিওরি পড়িয়েছে। হোমওয়ার্ক দিয়ে দিল, এলগরিদমগুলো জাভা অথবা সি অথবা পাইথনে ইমপ্লিমেন্ট করতে হবে। সেই সাথে টাইম কমপ্লিক্সিটির কতগুলো প্রুফ। কি বিপদ!!! শুরু হলো যুদ্ধ। জাভা ভুলে গিয়েছিলাম। শুরু করলাম নতুন করে।  

ডাটা মাইনিং এর ক্ষেত্রে একটা নতুন সফটওয়ার ধরিয়ে দেওয়া হল। ওয়েকা। ক্লাসে একদিন ওটা নিয়ে একটা ব্রিফ ইন্ট্রোডাকশন আর একটা পিডিএফ নোট দেওয়া হল। ওইটুকুই টিউটোরিয়াল। বাকীটুকু নিজে শিখে নিতে হবে। দেখলাম খুব একটা কঠিন না। প্রতি অধ্যায়ে দুইটা করে ল্যাব হত ওয়েকায়। ল্যাব বলতে ছিল, একটা পিডিএফ এ কিছু ইন্সট্রাকশন দেওয়া হত। আর ১০ টা প্রশ্ন।  ক্লাসে মূলত থিওরী পার্ট আলোচনা হত। ঝিমাইতে ঝিমাইতে চাইনিজ প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। কিছু বুঝতাম না। ল্যাবের দিন সমস্যা সমাধান করতে যেয়ে পুরো টপিক পড়ে ফেলতাম। ল্যাবের এসাইনমেন্ট জমা দিতে হতো ওইদিনই মাঝরাতের আগে। এসব এসাইনমেন্টে কেউ খারাপ করবে না এটা শিওর। কারণ, ওয়েকায় ডাটা এনালাইসিস করার পর ওই এনালাইসিসের উপর আমাদের নিজেদের চিন্তা ভাবনা কি এটাই লিখতে হত। কোন ভুল উত্তর নেই। যা লিখব সেটাই সঠিক। তবে উত্তর দিতে অনেক ঘাটতে হত ইন্টারনেট।

দ্রুতগতিতে এগোচ্ছিল সব। একটা হোমওয়ার্ক শেষ না হতেই আরেকটা। মাসখানেক পরেই মিডটার্ম-১ চলে আসল। কি পড়ব আর কি করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। পরীক্ষার আগের রাতে পড়ে পাশ করে অভ্যাস। এখানেও তাই করলাম। সারারাত পড়ে পরের দিন চোখ ফুলিয়ে এক্সাম দিতে গেলাম। পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখি মুখস্থ তেমন কিছু আসে নাই। এতদিন যা বুঝেছি এগুলো লিখতে হবে। যা পারলাম লিখলাম। ৩টা তেই খারাপ করলাম। চাপ বেড়ে গেল ১০ গুণ। শুরু হলো টিকে থাকার লড়াই।

দেশে থাকতে পরীক্ষার আগে শুধু পড়ার অভ্যাস ছিল আমার। তাও যে কতটুকু পড়তাম তা আমার রেজাল্ট দেখলেই বোঝা যায়। সেই অভ্যাস এখানে এসে পরিবর্তন করাটা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং ছিল। একটু সময় পেলে এখানেও ইউটিউব আর ফেসবুকে কাটিয়ে দিতাম। তবে পরের মিডটার্মে একটু ভালো করলাম। এতদিনে বুঝে গিয়েছি প্রশ্নের ধরণ আর কিভাবে উত্তর দিতে হবে। পুরো মুখস্থ কিছুই লিখতে হবে না। মূলভাবটা বোঝা থাকলে ওখান থেকে বানিয়ে বানিয়ে লিখলেই হবে।

স্ট্যাট ম্যম পরীক্ষা নিতেন দুই অংশে। একটা বাসায় বসে দিতে হবে। টেক হোম পোর্শন। ইচ্ছামতো বই আর নেট ঘেঁটে ওইটা সল্ভ করা যাবে। আরেকটা টেস্টিং সেন্টারে যেয়ে দিতে হবে। ইন ক্লাস পোর্শন। টেস্টিং সেন্টারে প্রতি পরীক্ষায় ৫ ইঞ্চি * ৮ ইঞ্চি একটা পেপারের একসাইডে যা ইচ্ছা লিখে নিয়ে যাওয়া যেত। ফাইনালের জন্য এরকম ৩ টা পেপার নেওয়ার অনুমতি ছিল। আমি অনুবীক্ষণ যন্ত্রেও উদ্ধার করা যাবে না এমন ছোট করে লিখে নিয়ে গিয়েছিলাম ১ম পরীক্ষায়। পরে দেখি, আমি নিজেই  বুঝি না। ম্যামের এই পরীক্ষা নেওয়ার পদ্ধতি আমার ভালো লেগেছে। আমি কখনো শিক্ষক হলে, শিক্ষার্থীদের এরকম অপশন দেব। দেখা যাবে টেক হোম পোরশন আর হেল্প কার্ড লিখতে লিখতেই শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু শিখে ফেলেছে। পরীক্ষা এমনিতে ভালো হয়ে যাবে। তবে উনি গ্রেডিং-এর ব্যাপারে অনেক কড়া। সামান্য বাক্য গঠনে উল্টা পাল্টা হলেও মার্ক কাটতেন। সে কারণে বাঁশের পর বাঁশবাগান জমা হলেও অনেক খুঁটিনাটি শিখে ফেলেছি।

ডেটা মাইনিং কোর্সে একটা সিম্পল প্রজেক্ট ছিল। ডিসিশন ট্রি এলগরিদম ইমপ্লিমেন্ট করতে হবে। ২ মাস সময় ছিল হাতে। কিছুই করার সময় পাই নি এর মাঝে। থ্যাংকস গিভিং এ ছুটির দুই দিন আগে কাজ শুরু করলাম। ছুটির দুইদিন পর জমা দিতে হবে। দুই দিনে অল্প কিছু একটু করে মাথায় টেনশন নিয়ে চলে গেলাম ঘুরতে। ফিরে এসে দুইদিন না ঘুমিয়ে ইমপ্লিমেন্ট করার চেষ্টা করলাম। কোন একটা এরর কিছুতেই ফিক্স করতে পারছিলাম না। প্রফেসরকে নক করে ২ দিনের এক্সটেনশন চাইলাম। উনি সময় বাড়িয়ে দিলেন। প্রজেক্টের টোটাল মার্ক ছিল ১৫০। আর কিছু এক্সট্রা জিনিস মেনশন করা ছিল প্রজেক্টে। ওগুলো ইমপ্লিমেন্ট করলে বোনাস ৫০। মেইন এবং বোনাস দুইটাই করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পুরোটা সঠিক হলো না। ডিসিশন ট্রি হইল ডাটা ম্যানুপুলেট করে একটা প্রেডিকশন দিবে। এরকমই একটা ট্রি। কিছু কিছু ডাটাসেটে আমার ইমপ্লিমেন্টশন প্রেডিকশন দিতে পারতেছিল না।  হাতে আর সময় না থাকায় ওইটাই সাবমিট করে দিয়েছিলাম।

ফাইনাল পরীক্ষাগুলো খুবই ঝামেলার ছিল। কোন কিছুই গুছিয়ে রাখি নি। একরাতে পুরো বই পড়ে ফেলতে হবে। কিন্তু কিছুই গোছানো নেই। বেছে বেছে দাগিয়ে-দাগিয়ে,  বাদ দিয়ে পড়ার কোন অপশন এখানে নেই। যেকোন কিছুই আসতে পারে। আর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট হিসেবে কমপক্ষে ৮০পারসেন্ট পেতেই হবে। একটা প্রশ্ন বাদ গেলেই ২০/২৫ মিস হয়ে যেতে পারে।  যদিও হোমওয়ার্ক/আগের পরীক্ষাগুলোয় ভালো থাকলে কাভার হয়ে যাবে। তাওতো রিস্ক। সত্যি বলতে একটা লাইনও দুইবার করে পড়তে পারিনি ফাইনালের জন্য। টপিকগুলোয় চোখ বুলিয়ে যেতেই সময় শেষ হয়ে গিয়েছিল। টার্গেট ছিল যাই প্রশ্ন আসুক উত্তর দিয়ে আসতে হবে। দিয়েও এসেছি তাই।

দেশের সাথে তুলনামূলক পার্থক্য তেমনভাবে করতে পারব না। আমি দেশেও ক্লাসে কিছু বুঝতাম না। এখানেও ক্লাসে কিছু বুঝিনা। দেশে বুঝতাম না, কারণ মনোযোগ দিতাম না। এখানে মনোযোগ দিতে চেষ্টা করেও পারি না। কারণ সারারাত ঘুমিয়ে ফ্রেস মাথায় ক্লাসে ঢুকলেও প্রফেসরের কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম। এটা আমার সমস্যা। তবে বড় একটা পার্থক্য আছে সিস্টেমে। আর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মন-মানসিকতায়। টিচারদের হাতে পুরো ১০০ মার্কস থাকে। গ্রেডিং কত থেকে কত হবে তাও তাদের হাতে থাকে। স্টুডেন্টদের হাতে থাকে সেমিস্টার শেষে এভালুয়েশন পাওয়ার।Sergeant First Class Robert H. Guthrie

আমেরিকায় উচ্চ শিক্ষা নিতে আগ্রহীদের বলব, পড়াশোনার তীব্র ইচ্ছা না থাকলে দেশেই ভালো কিছু করার চেষ্টা করতে। যাইহোক, কোনমতে প্রথম সেমিস্টার শেষ করলাম। ফলাফল যা পেয়েছি মোটামুটি সন্তুষ্ট। ক্রিসমাসের ছুটিতে ক্যাম্পাস বন্ধ এখন। তারপরও হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম ক্যাম্পাসে। প্রচন্ড শীত। গাথ্রি’র ভাস্কর্য্যের সামনে দাড়িয়ে ভাবছিলাম, প্রথমভাগের যুদ্ধ শেষ। আপাতত অল কোয়ায়েট ইন দ্যা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট।  

চন্দ্রশেখর
Author: চন্দ্রশেখর

মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

Permanent link to this article: https://www.borgomul.com/chondro/4708/


মন্তব্য করুন আপনার ফেসবুক প্রোফাইল ব্যবহার করে

5 comments

Skip to comment form

    • Nayem on December 19, 2018 at 12:15 pm
    • Reply

    Vallagsee vai

    • মোঃ মেহেদি হাসান হৃদয় on December 19, 2018 at 12:22 pm
    • Reply

    looks challenging….. and interesting also.

  1. 😀

  2. চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই।। ইন্টারেস্টটাই বড় কথা…

  3. লেখাটা পুরা ১ বছর পরে পড়লাম। অনেক ভালো একটা ধারণা পেলাম আসলে।

মন্তব্য করুন

Discover more from বর্গমূল | Borgomul

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading